বিশ্ববিদ্যালয় পরিচিতি ইতিহাসঃ


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্ম প্রক্রিয়ায় যেমন কল্যাণীর মমতার ছোঁয়া আছে, তেমনি অকল্যাণীর তীক্ষ্ণ নখরাঘাতের চিহ্নও আছে। জন্ম প্রক্রিয়া শুরম্ন হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। বাংলাদেশের যেসব জেলায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই তেমন ১২টি বৃহত্তর জেলায় ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করে। প্রথম পর্যায়ে বাসত্মবায়নের জন্য ৬টি উন্নয়ন প্রকল্প প্রসত্মাব প্রণয়ন করা হয়। এই ৬টির মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটি ছিল অন্যতম। ১৯৯৯ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগের প্রফেসর ড. এম. খায়রম্নল আলম খানকে প্রকল্প পরিচালক নিযুক্ত করে গোপালগঞ্জে পাঠানো হয়। প্রকল্প পরিচালক তাঁর ঐকামিত্মক প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচন, জমি অধিগ্রহণ (প্রায় ৫৫একর) এবং জমি ভরাটের কাজ সম্পন্ন করেন। ইতোমধ্যে ২০০১ সালের ৮ জুলাই মহান জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণীত হয়। ২০০১ সালের ১৩ জুলাই তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রসত্মর স্থাপন করেন। ১৪ জুলাই তদানীমত্মন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে প্রফেসর ড. এম. খায়রম্নল আলম খানকে নিয়োগের সুপারিশ করেন এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি ১৯ জুলাই ২০০১ উক্ত নিয়োগ অনুমোদন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষে ১৫ জুলাই ২০০১ তারিখ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তত্তাববধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি লতিফুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হসত্মামত্মর করেন। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণ করেই প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান গোপালগঞ্জ, রংপুর ও রাঙ্গামাটিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম স্থগিত করে দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে জামায়াত-বিএনপি-এর চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েই ২০০২ সালের ১৫ এপ্রিল হিংসার বশবর্তী হয়ে জাতির জনকের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে এবং ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এম. খায়রম্নল আলম খানের নিয়োগ বাতিল করে এবং তাঁকে তাঁর পূর্বতন প্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের নির্দেশ দেয়। তাছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকুরিচ্যুত করে, ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হন। জননেত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় অর্জন করে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এলে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাগ্যাকাশ থেকে অমানিশার ঘোর অন্ধকার কাটতে শুরম্ন করে। ২০০৯ সালের নভেম্বরে স্থগিত প্রকল্পটি পুনর্জীবিত হয় এবং ২০১০ সালের ৫ জানুয়ারি সদাশয় বর্তমান সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রফেসর ড. এম. খায়রম্নল আলম খানকে আবারও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করেন এবং ২০ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ আইন-২০০১ বাসত্মবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এসআরও জারী করে। পরবর্তীতে ১৪ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ জিলস্নুর রহমান প্রফেসর ড. এম. খায়রম্নল আলম খানকে পুনরায় ৪ বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন এবং ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখে মেয়াদ শেষ করেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ ২ ফেব্রম্নয়ারি ২০১৫ তারিখে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. খোন্দকার মোঃ নাসিরউদ্দিনকে ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে ৪ বছরের জন্য নিয়োগ প্রদান করেছেন।


অবকাঠামোগত অবস্থাঃ

প্রায় ৫৫একর জমিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরম্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ২০০৯ সালের ২৪ নভেম্বর একনেকে ৯১কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাশ হয়। অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে একাডেমিক ভবন, ছাত্র হল ০২টি, ছাত্রী হল ০১ টি, প্রশাসনিক ভবন, লাইব্রেরি ভবন, ক্যাফেটারিয়া, মসজিদ, ভিসির বাসভবন, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ডরমিটরি ২টি, কর্মচারীদের কোয়ার্টার, পানি শোধনাগার, অভ্যমত্মরীণ রাসত্মা, সীমানা প্রাচীর ইত্যাদি। শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরের তত্ত্বাবধানে এসব অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

বর্তমানে ছাত্রদের ৫০০ আসন বিশিষ্ট ০২টি এবং ছাত্রীদের ২৫০ আসন বিশিষ্ট ০১টি হলে ছাত্র-ছাত্রীদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ৩টি হল, একাডেমিক ভবন ও লাইব্রেরি ভবনের নামকরণ করেছে। হল ০৩টির নাম যথাক্রমে স্বাধীনতা দিবস হল, বিজয় দিবস হল এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল। একাডেমিক ভবনের নাম- আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু একাডেমিক ভবন এবং লাইব্রেরি ভবনের নাম- একুশে ফেব্রম্নয়ারি লাইব্রেরি ভবন করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ০২টি ডরমিটরি,৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী কোয়ার্টার, লাইব্রেরি ভবন, ভাইস-চ্যান্সেলরের বাসভবন, কেন্দ্রীয় ক্যাফেটারিয়া, সীমানা প্রাচীর এবং প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণ কাজও শেষ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য একটি পানি শোধনাগার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। তাছাড়া অভ্যমত্মরীণ রাসত্মা ও মসজিদ নির্মাণের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ২টি বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড-এর পক্ষ থেকে বাস ২টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হসত্মামত্মর করা হয়েছে।

ছাত্র-ছাত্রীদের উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আধুনিক ল্যাবরেটরি। দেওয়া হয়েছে দ্রম্নত গতির ইন্টারনেট (ব্রডব্যান্ড ও ওয়াই ফাই) সংযোগ। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষ করতে গড়ে তোলা হয়েছে ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ল্যাব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সম্প্রতি একনেকের সভায় ১০৫ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প প্রসত্মাব অনুমোদন করেছে। প্রকল্প বাসত্মবায়নের মেয়াদ ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যমত্ম। ডিপিপিতে অমত্মর্ভুক্ত অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে একাডেমিক ভবন-, ছাত্র ও ছাত্রীদের ২টি হল, শি-কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন, কর্মচারীদের কোয়ার্টার, বঙ্গবন্ধুর মূরাল, মেইন গেট, অডিটোরিয়াম, লাইব্রেরি ভবনের সম্প্রসারণ, দৃষ্টিনন্দন জলাধার, জিমনেসিয়াম নির্মাণ, পুকুর খনন ইত্যাদি।


একাডেমিক কার্যক্রমঃ

প্রথম পর্যায়ে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসে চারটি অনুষদ; ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান, বিজনেস স্টাডিস এবং হিউমেনিটিজ অনুষদে পাঁচটি বিভাগ যথাক্রমে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স, গণিত, ব্যবস্থাপনা এবং ইংরেজি বিভাগ খোলা হয় এবং প্রতি বিভাগে ৩২ জন করে মোট ১৬০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরম্ন করে। পরবর্তীতে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে আরও নতুন ২টি অনুষদ (জীব বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান) ও ৬টি বিভাগ চালু হয়। বিভাগগুলো হলো- ফার্মেসি, ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, এ্যানালাইটিক্যাল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল কেমিস্ট্রি, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি ও সমাজ বিজ্ঞান। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির আসন সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয় এবং ১১ বিভাগে মোট ৫২০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে আরও ৩টি বিভাগ ও একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। বিভাগগুলো হলো বাংলা, লোক প্রশাসন ও একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস। গবেষণা ইনস্টিটিউটটির নাম হলো "Bangabandhu Institute of Liberation War and Bangladesh Studies"। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ১৪ বিভাগে সর্বমোট ৬৭০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। ২০১১-১২,২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের একাডেমিক কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।

এ বছর অর্থাৎ ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ১৪টি বিভাগে ৭৪৭ জন এবং উক্ত ইনস্টিটিউটে পিএইচডি'র ২জন ও এম ফিল কোর্সে ৫জন শিাক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।


ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাঃ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয়ের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ভিশন-২০২১ কে টার্গেট করে ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মাত্র ০৫টি বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরম্ন হলেও আগামি ১০ বছরে পর্যায়ক্রমে ৩২ বিষয় খোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে আরও দুটি গবেষণা ইনস্টিটিউট খোলা হবে। এ ইনস্টিটিউট দুটি বাংলাদেশের শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

বর্তমান সরকার উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার উপর গুরম্নত্ব দিয়ে যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে, যে শিক্ষানীতির ফলে তৈরি দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদগণ শুধু দেশের সম্পদই নয় বিশ্বেরও সম্পদ হতে পারেন। এ দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে যাচেছ।